সমঝোতার মাধ্যমে গঠিত ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নতুন পর্ষদে পরিচালক হওয়ার জন্য প্রশাসক নিয়োগ অবৈধ সংক্রান্ত রীট মামলার পক্ষ বা পার্টি হতে আবেদন করেছেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা ৬ বছর ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে তিনি ২০১২ সালে কোম্পানির পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
গত ২৪ জুলাই বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সমঝোতার মধ্য দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয় প্রশাসক বসানো হবে ডেল্টা লাইফে। ওই বৈঠকে আইডিআরএ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও ডেল্টা লাইফের সাসপেন্ডেড পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও নতুন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ডেল্টায় প্রশাসক বসানোর নেপথ্যের কারণ
ডেল্টা লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, ২০১৯ সালের ১ জুলাই কোম্পানিতে স্পন্সর পরিচালক হিসেবে থাকতে ডেল্টা লাইফের তখনকার চেয়ারম্যান লে. জে. এম নুর উদ্দিন খান, পিএসসি (অব.) বরাবর আবেদন করেন। ওই আবেদনের অনুলিপি দেয়া হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন ডেল্টা লাইফে উদ্যোক্তা পরিচালক পদে থাকার আবেদনের ৩ মাস পর অর্থাৎ ৬ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে অনিয়ম দুর্নীতি ক্ষতিয়ে দেখতে ডেল্টা লাইফে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ফেমস এন্ড আর’কে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই সাথে ১৮ আগস্ট আইডিআরএ’র পরিচালক (উপসচিব) শাহ আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ফেমস এন্ড আর’কে তথ্য দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ তুলে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয় মঞ্জুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদকে।
এর পরেই ডেল্টা লাইফের মুখ্য নির্বাহী আদিবা রহমানের নিয়োগ নবায়নের জন্য আবেদন করে ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। পরে ১৯ নভেম্বর ২০২০ তারিখে আদিবা রহমানের নবায়ন নিয়োগের এ আবেদন নাকোচ করে দেয় তৎকালীন আইডিআরএ চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেন। আদিবা রহমানের আবেদন নাকোচ করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, “বীমা আইন ২০১০ এর ১৩০ এর (খ) ধারা অনুসারে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পরিপালন না করা, কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা, কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগ থাকা, কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুসারে তথ্য প্রদান না করা।”
পরে ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সাসপেন্ড করে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। পরে গত দেড় বছরে ৩ দফায় প্রশাসক পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে আছেন আইডিআরএ’র সাবেক সদস্য কুদ্দুস খান।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের স্পন্সর পরিচালক হিসেবে থাকার আবেদনের পরই ডেল্টা লাইফে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ ও কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আদিবা রহমানের নিয়োগ নবায়নের আবেদন নাকোচ করে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে প্রশাসক নিয়োগ দেয় ড. এম মোশাররফের নেতৃত্বাধীন আইডিআরএ।
প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার পরও ২০২১ সালের ২৪ জুন ডেল্টা লাইফে চার ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি ‘পরামর্শক কমিটি’ গঠন করে ড. এম মোশাররফের নেতৃত্বাধীন আইডিআরএ। ডেল্টা লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনকেও সদস্য করা হয় ওই পরামর্শক কমিটিতে।
তবে ডেল্টা লাইফের এই পরামর্শক কমিটির বিরোধিতা করে পরবর্তীতে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন বীমা কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান। এরই প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বর শুনানি শেষে ডেল্টা লাইফের ওই পরামর্শক কমিটি বাতিল করেন হাইকোর্ট।
ডেল্টা লাইফে ড. মোশাররফের ঘুষ চাওয়ার অডিও ফাঁস
স্পন্সর পরিচালক থাকতে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের আবেদনকে ঘিরে ডেল্টা লাইফের বিরুদ্ধে একের পর এক ব্যবস্থা নেয়ার মাঝেই ২ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে আইডিআরএ’র পদত্যাগী চেয়ারম্যান ড. মোশাররফের বিরুদ্ধে। এ সময়ে ঘুষ চাওয়ার অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনা ‘টক অব দ্যা কান্ট্রিতে’ পরিণত হয়। যা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ পৌঁছায়। একই সময়ে ডেল্টা লাইফে প্রশাসক বসাতে ড. মোশাররফ কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।