বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী সরকার পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপির জয় দলটির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা অনেক ত্যাগী নেতা স্থান পেয়েছেন।
তবে আনন্দের এই আবহের মধ্যেই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতিত ও রাজপথে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা অনেক নেতাকর্মী নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন। ফলে দলীয় কর্মীদের একাংশের মধ্যে নীরব হতাশা বিরাজ করছে।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক ডাকসু ভিপি আমানুল্লাহ আমান এবং যুগ্ম-মহাসচিব ও সাবেক ডাকসু জিএস খায়রুল কবির খোকন মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।
এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নাজিম উদ্দীন আলম, যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরফত আলী সপু, সহ যুব বিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান এবং নিপুণ রায় চৌধুরীও প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাননি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, ক্রীড়া সম্পাদক নিলুফা ইয়াসমিন নিলু, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বিথিকা বিনতে হুসেইন, ছাত্রদলের সাবেক নেতা শাহবুদ্দিন মুন্না, আরিফা সুলতানা রুমা এবং নাদিয়া পাঠান পাপনও মূল্যায়নের বাইরে রয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা ছাত্রদলের বহু সাবেক নেতাকর্মীর মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক মুন্না, শওকত আরা ঊর্মি, নাসিমা আক্তার কেয়া, মনিরা আক্তার রিক্তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাসার সিদ্দিকী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মুনিরুজ্জামান, জিকরুল হাসান, মিজানুর রহমান মিজান, হুমায়ন কবির, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দীন এবং ওমর ফারুক কাওসারের মতো অনেক নেতাকর্মী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় থেকে বহু মামলা-হামলার আসামি হওয়া, কারাবরণ, পঙ্গুত্ব কিংবা ঘরছাড়া হওয়ার মতো কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের অনেককে। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের একটি বড় অংশ নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন।
তবে দলীয় অনেক নেতাই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করছেন। কারণ গণমাধ্যমে ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে কিছু অনুসারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এতে বিব্রত বোধ করছেন অনেক ত্যাগী নেতা। বিএনপির সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল ইতোমধ্যে অনুসারীদের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে কোনো ধরনের পোস্ট না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে সরকার গঠনের আনন্দের পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগী অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে নীরব হতাশার সুরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে নারী নেত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন। অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতির অনেক সাবেক নেতা হয়তো অবমূল্যায়িতই থেকে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তাদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে।